রূপগঞ্জে জুস ফ্যাক্টরীতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড আগুন নিয়ন্ত্রনে ২২ঘন্টা, ৫২ জনের লাশ উদ্ধার # ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

সংবাদটি শেয়ার করুন:

স্বাধীন বাংলাদেশ রিপোর্ট:
রূপগঞ্জের ভুলতা কর্ণগোপ এলাকায় সজীব গ্রুপের হাশেম ফুড এন্ড বেভারেজ ফ্যাক্টরিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সর্বশেষ ৫২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে অগ্নিকাণ্ডটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৫ জনে দাঁড়াল। দীর্ঘ ২২ঘন্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর গতকাল শুক্রবার (৯ জুলাই) দুপুর সোয়া একটার পর কারখানার অভ্যন্তর থেকে লাশগুলো বের করতে থাকেন উদ্ধারকর্মীরা। জেলা ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন লাশ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, ফায়ার সার্ভিসের গাড়িতে ৪৯ জনের লাশ উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তবে এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে জানান তিনি। ফায়ার সার্ভিস বলছে, চতুর্থ তলাটি ছিল তালাবদ্ধ। যে কারণে সেখানে কর্মরত শ্রমিকরা বের হতে পারেননি। আগুনে কেড়ে নিয়েছে তাদের প্রাণ।
সকাল থেকে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমান, জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ, জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ জানিয়েছে উদ্ধার হওয়া লাশ ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হবে।
এদিকে কারখানায় আগুনের ঘটনায় প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন। এর মধ্যে ৩৩ জনের নাম-পরিচয় পেয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
প্রতিষ্ঠানটির এডমিন ইনচার্জ সালাউদ্দিন মিয়া জানান, অগ্নিকাণ্ডের সময় সেকশনের পাঁচটি ফ্লোরে প্রায় চারশত শ্রমিক ওভারটাইম করছিলেন।
এরআগে, আগুনে তিন জনের নিহতের তথ্য জানানো হয়। এরা হলেন, স্বপ্না রানী (৪৪), মিনা আক্তার (৪৩) ও মোরসালিন (২৪)। নিহত স্বপ্না হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার গুলডুবা এলাকার যতীন সরকারের স্ত্রী ও নিহত মীনা কিশোরগঞ্জের কমিরগঞ্জ উপজেলার উত্তরকান্দা কুকিমাদল গ্রামের হারুনের স্ত্রী। তারা উভয়ই কারখানার ওডি সেকশনের শ্রমিক বলে নিশ্চিত বরেন সেখানকার অপারেটর আজিজ মিয়া।
এছাড়া আগুনে আহত হয়েছেন আরও প্রায় অর্ধশত শ্রমিক। তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) বিকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিট দীর্ঘ প্রায় ২২ ঘণ্টার চেষ্টায় শুক্রবার দুপুরের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই নিখোঁজ শ্রমিকদের জন্য স্বজনরা ফ্যাক্টরির সামনে অপেক্ষা করছিলেন। আগুন নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘ সময় লাগায় স্থানীয়রা কারখানায় হামলাও চালায়। এসময় সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আহত হন। আনসার সদস্যদের তিনটি শটগানও খোয়া যায়। পরে দুটি শটগান উদ্ধার হয়।
এদিকে, আগ্নিকান্ডের ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম বেপারীকে আহবায়ক করে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, রূপগঞ্জ উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা, ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক, পুলিশের একজন প্রতিনিধি এবং কলকারখানা অধিদফতরের একজন প্রতিনিধি। সাতদিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ জানান, আগুনের ঘটনায় কত জন নিখোঁজ আছেন, তার একটি তালিকা প্রস্তুত করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কাজ চলছে। স্বজনদের তথ্য অনুযায়ি নিখোঁজদের নাম তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হবে। একই সাথে যারা ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসাধীন রয়েছে তাদেরও একটি তালিকা করা হচ্ছে।

রূপগঞ্জ ট্র্যাজেডি  নিখোঁজ

৫১ শ্রমিকের তালিকা

রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের সেজান জুস কারখানায় আগুনের ঘটনায় ৫১ শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের পরিবারের সদস্যরা তাদের খুঁজছেন। প্রিয় স্বজনের খোঁজে বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) সন্ধ্যা থেকে গতকাল শুক্রবার (৯ জুলাই) বিকাল পর্যন্ত কারখানার সামনে অপেক্ষা করছেন তারা।

নিখোঁজ শ্রমিকরা হলেন—ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার গোলামের ছেলে মো. মহিউদ্দিন, একই উপজেলার ফখরুল ইসলামের ছেলে শামীম, ভোলা জেলার ইসমাইলের মেয়ে হাফেজা, নারায়ণগঞ্জের হাকিম আলীর মেয়ে ফিরোজা বেগম, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার তাহের উদ্দিনের ছেলে নাঈম, একই জেলার নিতাই উপজেলার স্বপনের মেয়ে শাহিদা, মৌলভীবাজারের পরবা বরমনের ছেলে কমপা বরমন, ভোলার তাজুদ্দিনের ছেলে রাকিব, কিশোরগঞ্জের কাইয়ুমের মেয়ে খাদিজা, নেত্রকোনার জাকির হোসেনের মেয়ে শান্তা মনি, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার সেলিমের স্ত্রী উর্মিতা বেগম, কিশোরগঞ্জের কাইয়ুমের মেয়ে আকিমা, নেত্রকোনার কবির হোসেনের মেয়ে হিমা, রংপুরের মানসের ছেলে স্বপন, কিশোরগঞ্জের মাহাতাব উদ্দিনের স্ত্রী শাহানা, একই জেলার গোলাকাইন্দাইল খালপাড়ের রাজিবের স্ত্রী আমেনা, কিশোরগঞ্জের আব্দুর রশিদের মেয়ে মিনা খাতুন, পাবনার হাঠখালির শাহাদত খানের ছেলে মোহাম্মদ আলী, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ফজলুর ছেলে হাসনাইন, জামালপুরের মো. শওকতের ছেলে জিহাদ রানা, কিশোরগঞ্জের মো. সেলিমের মেয়ে সেলিনা, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ফিরোজা, তার মেয়ে সুমাইয়া, নরসিংদীর শিবপুরের জসিম উদ্দীনের স্ত্রী রিমা, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার সুজনের মেয়ে রিনা আক্তার, চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার হাছান উল্লাহর ছেলে পারভেজ, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার গোকুলের ছেলে মাহাবুব, গাজীপুরের সেলিম মিয়ার ছেলে রিপন মিয়া (ইয়াসিন), ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার মান্নান মাতাবরের ছেলে নোমান মিয়া, দোলাকান্দাইল উপজেলার আফজালের স্ত্রী নাজমা বেগম, নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার আবল কাশেমের ছেলে রাসেদ, নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার এনায়েতের ছেলে বাদশা, ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার ইউসুফ, নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার আবুল বাসারের ছেলে জিহাদ, শাকিল, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের খোকনের স্ত্রী জাহানারা, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার কবিরের ছেলে মো. রাকিব, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ থানার সুরুজ আলীর মেয়ে ফারজানা, কিশোরগঞ্জের চানমিয়ার ছেলে নাজমুল, কিশোরগঞ্জের বাস্তু মিয়ার ছেলে তাছলিমা, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার মো. রাকিব, নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার মো. বাহারের ছেলে মো. আকাশ, কিশোরগঞ্জের বাচ্চু মিয়ার মেয়ে তাছলিমা, কিশোরগঞ্জের আজিজুল হকের মেয়ে মোছা. রহিমা, গাইবান্ধার প্রফেসর কলনির হাসানুজ্জামানের মেয়ে নুসরাত জাহান টুকটুকি, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি থানার চান্দু মিয়ার মেয়ে রাবেয়া, কিশোরগঞ্জের মালেকের মেয়ে মাহমুদা, নেত্রকোনার খালিয়াঝুড়ি উপজেলার আজমত আলীর মেয়ে তাকিয়া আক্তার, হবিগঞ্জের আব্দুল মান্নানের মেয়ে তুলি, কিশোরগঞ্জের নিজামউদ্দিনের মেয়ে শাহানা, দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার ফয়জুল ইসলামের ছেলে সাজ্জাদ হোসেন সজীব, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থানার লালচু মিয়ার ছেলে লাবণ্য আক্তার।
প্রসঙ্গত, রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজের সেজান জুস কারখানায় বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) বিকাল সাড়ে ৫টায় আগুনের সূত্রপাত হয়। কারখানার ৬ তলা ভবনটিতে তখন প্রায় চারশ’র বেশি কর্মী কাজ করছিলেন। কারখানায় প্লাস্টিক, কাগজসহ মোড়কিকরণের প্রচুর সরঞ্জাম থাকায় আগুন মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে সব ফ্লোর প্রচুর পরিমাণ দাহ্য পদার্থ থাকায় কয়েকটি ফ্লোরের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিটের ২০ ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। শুক্রবার (০৯ জুলাই) দুপুরে কারখানার ভেতর থেকে ৪৯ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এর আগে, আগুনে পুড়ে তিন জনের মৃত্যু হয়। সবমিলে এ পর্যন্ত ৫২ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। কারখানায় আগুনের ঘটনায় প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন। ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

 


সংবাদটি শেয়ার করুন:

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *