পুলিশকে হত্যার চেষ্টা করেছে হকাররা

সংবাদটি শেয়ার করুন:

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি:
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে হত্যাচেষ্টার পর এবার পুলিশকে হত্যার চেষ্টা করেছেন বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতে বসা হকাররা। গত বুধবার (১০ মার্চ) এমন অভিযোগে সদর মডেল থানায় একটি মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় গ্রেফতার হকার সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আসাদুল ইসলামসহ ২৮০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর আগে ২০১৯ সালের ৪ ডিসেম্বর সিটি মেয়র আইভীর উপর হত্যাচেষ্টার উদ্দেশ্যে হামলার অভিযোগে মামলা করা হয়েছিল। ওই মামলায় ৯ জনের নামোল্লেখ সহ আরও ১০০০ জনকে আসামি করা হয়।
শহরের সবচেয়ে ব্যস্ততম বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাত হকার মুক্ত রাখার দীর্ঘদিনের দাবি নগরবাসীর। সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বরাবরই হকারমুক্ত বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতের কথা বলেছেন। পৌরসভার মেয়র থাকাকালীন সময়ে চাষাঢ়ায় একটি হকার্স মার্কেটও করে দেন তিনি। তারপরও বঙ্গবন্ধু সড়কে হকার বসলে সড়কটি ছেড়ে আশেপাশের অলিগলি, খানপুরে হাসপাতালের সামনের সড়কে বসে ব্যবসা করার জন্য হকারদের প্রস্তাব দেন মেয়র। হকার নেতা, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়হীনতাসহ নানা কারণে তা বাস্তবায়ন হয়ে ওঠেনি। ফুটপাত ছিল হকারদের দখলে। এদিকে নগরবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে মানুষের অবাধে চলাচল নিশ্চিতের জন্য ফুটপাত হকার মুক্ত রাখার উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। তৎকালীন পুলিশ সুপারের নির্দেশে হকারমুক্ত ফুটপাত রাখার জন্য অভিযান অব্যাহত রাখে। তবে এর বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠে হকাররা। বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতে বসেই ব্যবসা করার দাবি জানায় তারা। হকারদের সমর্থন দেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমান। এ নিয়ে মেয়র ও সাংসদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য শোনা যায় তখন। এরপর ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে আহত হন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী, নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শরীফ উদ্দিন সবুজ, পুলিশসহ শতাধিক ব্যক্তি। এই ঘটনার জন্য নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ একেএম শামীম ওসমানকে দায়ি করেন সিটি মেয়র আইভী। ওই ঘটনায় থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করলে সে সময় তা জিডি হিসেবে গ্রহণ করেন সদর মডেল থানা পুলিশ।
পরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে নারায়ণগঞ্জ জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম ফাহমিদা খাতুনের আদালত মামলার বাদী সিটি করপোরেশনের আইন কর্মকর্তা জিএম সাত্তারের অভিযোগটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করতে সদর থানার ওসিকে নির্দেশ দেয়।
মামলায় আসামি করা হয় সেদিন অস্ত্র নিয়ে হামলাকারী নিয়াজুল ইসলাম, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম, সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলাল, মহানগর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি জুয়েল হোসেন, জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান, যুবলীগ নেতা জানে আলম, আওয়ামী লীগ নেতা নাছির উদ্দিন ও চঞ্চল মাহমুদ। এই নয়জন ছাড়াও মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ৯০০ থেকে ১০০০ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি বিকেল চারটায় সিটি মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী কাউন্সিলর ও অন্যদের সঙ্গে নিয়ে নগর ভবন থেকে পদযাত্রা শুরু করেন। বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাত হকারমুক্ত রাখা এবং পথচারীদের নির্বিঘ্নে চলাচলের স্বার্থে গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে হেঁটে প্রচারণা শুরু করেন মেয়র। বিকেল সাড়ে চারটায় পদযাত্রাটি বঙ্গবন্ধু সড়কের চাষাঢ়া সায়েম প্লাজার সামনে এলে পূর্বপরিকল্পিতভাবে বিবাদীরা অত্যাধুনিক পিস্তল, রিভলবার, শটগান ও দেশি অস্ত্র নিয়ে মেয়র আইভীকে হত্যার উদ্দেশ্যে চারদিক থেকে হামলা করে। বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ছোড়া হয়। মেয়রসহ সঙ্গে থাকা লোকজনকে হত্যার উদ্দেশ্যে এই হামলা চালানো হয়। হামলায় আইভীসহ ৪৩ জন গুরুতর আহত হন।
এতকিছুর পরও হকারদের দৌারাত্ম থামানো যায়নি। ফুটপাত দখল করে পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটাচ্ছিল তারা। এদিকে গত বছরের ডিসেম্বরে জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলমের নির্দেশে ফুটপাত হকারমুক্ত রাখতে অভিযান শুরু করে জেলা পুলিশ। গত ১৩ ডিসেম্বর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) সালেহ উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু সড়কের ফুটপাতে বসা হকারদের উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে। ওই সময় সদর মডেল থানার ওসি শাহ্ জামানও অভিযানে উপস্থিত ছিলেন। এরপর থেকে নিয়মিত বঙ্গবন্ধু সড়কে টহল দিচ্ছে পুলিশ। পুলিশ দেখলে দৌড়ে সড়কের কোনো গলির ভেতর আর সরে গেলেই ফুটপাতে দখল নিছে হকাররা। এভাবেই চলছিল হকার ও পুলিশের ইদুর-বেড়াল খেলা। তবে গত ২ মার্চ থেকে লাগাতার পুলিশের কঠোর অবস্থানের বিরুদ্ধে সড়কে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করছে হকাররা। এই বিক্ষোভ গত ৯ মার্চ চরম পর্যায়ে গিয়ে পৌছায়। ওইদিন বিকেলে পুলিশের লাঠিচার্জের অভিযোগ তুলে শহরের সড়কগুলোতে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ, গাড়ি ভাঙচুর ও পুলিশের উপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় পুলিশের ১১ জনসহ ২০ জন আঘাতপ্রাপ্ত হন।
হকারদের তাণ্ডবের ঘটনায় হত্যার উদ্দেশ্যে পুলিশের উপর হামলা, অস্ত্র লুটের চেষ্টা, সরকারি কাজে বাধা, সড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন অভিযোগে হকার নেতা আসাদসহ ৩০ জনের নাম উল্লেখ করে ২৮০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ। সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ নুরুজ্জামান বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। এই মামলায় জেলা হকার সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আসাদুল ইসলাম, কালু গাজী (৪০) ও মানিক দেওয়ানকে (৩১) গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। মামলায় উল্লেখিত ৩০ জন হলেন- ট্রেড ইউনিয়ন নারায়ণগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক বিমল কান্তি দাস, নারায়ণগঞ্জ হকার সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক আসাদুল ইসলাম (৪০), কালু গাজী (৪০), মানিক দেওয়ান (৩১), সোহেল (৩৫), টিপু (৪৫), যুবরাজ (৪০), সাজ্জাদ হোসেন (৪৫), কায়েস দর্জি (২৩), আল-আমিন (১৮), সিদ্দিক (৩৫), বিল্লাল হোসেন (২৫), রায়হান (২২), মামুন (২৭), হৃদয় (১৮), জাহাঙ্গীর (৩২), শফিকুল (১৮), এরশাদ (৪০), বিপ্লব মল্লিক, রাজু, রিয়াদ, নিজাম, করিম, সোহেল, লিজন, নাসির, সাইফুল, শহীদুল ইসলাম, আমিনুল, মাহবুব। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা, হত্যার উদ্দেশ্যে পুলিশের উপর হামলা, আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে যানজট সৃষ্টিসহ নানা অভিযোগ আনা হয়েছে। গ্রেফতার হকার নেতা আসাদুল ইসলামসহ তিনজনের ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। পরে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাওসার আলমের আদালত রিমান্ড শুনানির জন্য আগামী ১৪ মার্চ (রোববার) তারিখ ধার্য করেন। এদিকে হকারদের এই আন্দোলনকে স্বাভাবিক হকার আন্দোলন হিসেবে দেখছেন না নগরবাসী। আন্দোলনের নামে সড়কে আগুন জ্বালিয়ে তাদের এই তান্ডবকে অশনিসংকেত বলে মনে করছেন তারা। আন্দোলনের নামে পুলিশের উপর হামলা, আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ, যানবাহনে ভাঙচুর বড় পরিকল্পনার অংশ বলে মনে করছেন তারা। নগরবাসী বলছেন, বিভিন্ন সময় হকারদের শহর অচল করে দেয়ার হুমকি, মেয়রের বাসভবন ঘেরাও করার হুমকি একই সূত্রে গাঁথা। মেয়রের উপর হামলা ও সর্বশেষ ঘটনায় তারা যেভাবে তান্ডব চালিয়েছে তাতে তাদেরকে সাধারণ হকার হিসেবে মানতে নারাজ নগরবাসী। তারা মনে করছেন, হকারের আড়ালে তারা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালানোর পরিকল্পনা চলছে। কিন্তু এদের প্রশ্রয়দাতা কারা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কার ইন্ধনে তারা এতোটা দুর্র্ধষ ভূমিকায়। যার কারণে তাদের কাছে অনেকটাই জিম্মি নারায়ণগঞ্জবাসী।


সংবাদটি শেয়ার করুন:

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *